প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার দ্রুতি ও মন্দন

প্রকাশিত...... বন্ধুরা পড়ে দেখতে পারেন...... মন্তব্য স্বাগত 

কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা:  জেগে থাকা অন্ধকার যেখানে মাথা নত করে 
      -----------------------------------------
            দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় 
               উত্তরপাড়া, হুগলি 
                       *********

" ন দৃষ্টেদ্রষ্টারং পশ্যেন শ্রুতেঃ শ্রোতারং শৃণুয়া
 ন  মতেমন্তারং মন্বীথা ন বিজ্ঞাতেবিজ্ঞাতারং বিজানীয়া: ।"
দৃষ্টির স্রষ্টাকে দেখতে চাওয়া নয়, শ্রবণের শ্রোতাকে শুনতে চাওয়া নয়, মনোবৃত্তির মননকারীকে মনন করতে চাওয়া নয়, বুদ্ধিবৃত্তির বিজ্ঞাতাকে জানতে চাওয়া নয়।অন্তরেই তার নিত্য প্রকাশমানতা, সেই তার নিত্য অধিষ্ঠান।জ্ঞান জ্ঞাতা জ্ঞেয় শ্রুতি --সব সেখানে একাত্ম হয়ে যায়। সুধীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন ---
" ভরা নদী ,তার আবেগের প্রতিনিধি,
অগাধ সাগরে উধাও অগাধ থেকে;
অমল আলোয় মুখরিত তার হৃদি;
স্বাতী মণিময় তারই প্রত্যভিষেকে।"
ভাবের এই দেউলে নয় শুধু, গাছের রসের মতো প্রবাহিত ভাব বিনিময় আঙ্গিকতায় বাঁধা পড়ে অন্তেবাসীদের সাগরবলয় কল্লোল ক্রিয়া ও অব্যয়ের যুক্তিজালে। কিনারের বিপুল জলরাশির তরঙ্গায়ন যেন প্রশ্ন করে চলে উত্তেজনার অভিনব উৎসারণে ---"কোথায় উড়ে যাবে? " এই অন্তর্দৃষ্টির গল্পটাই শব্দের খোলস খুলে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের ভাষার নাটমন্দিরে। ডায়াবেটিসের রোগীকে যেমন মিষ্টির বিকল্প হিসেবে নন - নিউট্রিটিভ সুইটনার দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি স্বাভাবিকতা ছায়ার মতো ম্লান থেকে ম্লানতর হতে থাকলে প্রেমেন্দ্র মিত্রের গাঢ় থেকে গাঢ়তর ধ্বনি ----
" মিথ্যেই 
মিল- খোঁজা মন চায় উপমা।
      নেই, নেই !
হৃদয় দুচোখ হয়ে, শুধু গেয়ে ওঠে ,
         সেই ! সেই ! "
একটা 'জোনাকি মন ' মৃত্তিকায় শিউলির আমন্ত্রণের রহস্য বোঝে। উৎসের গভীরে আমন্ত্রণ যে এ ! মাটির ভিতর থেকে দূর বহুদূরের পরাচেতনস্পর্শ।কাব্যিকতার মৌল ছাঁচে ধূলিধূসর দেহ বোধের কেন্দ্রে পৌঁছনোর পিপাসায় পাললিক ----
" এ জোনাকি -মন জানি 
             কোনো দিন পাবে না উত্তর।
চারিদিকে অন্ধরাত্রি তামসী, দুস্তর,
              মৌন নিরন্তর।
তারই মাঝে জিজ্ঞাসার স্ফুলিঙ্গের মতো 
  এ জোনাকি - মন যেন 
অকারণে ফোটে আর ঝরে,
মিছে ভাবে, সব থাকা তারই বৃন্ত ধরে।"

    কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা - সফর যেন এক মৃগয়া। Walt Whitman এর মতো তার কবিতার অশ্বমেধের ঘোড়ার খুরে ওঠা ধুলোয় ভাবনার জাল বোনে ভুবনলতার আকাশ ---" I am large,I contain multitudes"।কবি আমিকেন্দ্রিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বাইরে প্রাণবস্তুর দারুন মোহময় উপস্থিতির আকর্ষণের ছদ্মবেশে চিন্তাধ্যান ও বোধ - কল্পনা মনীষার বহুমাত্রিক দ্যোতনার প্রবলতর আবেগ উদ্যত বর্শার মতো 
ছুঁড়ে দেন ঝড়ের ঝুঁটিতে।তার অঙ্গে রাজপুত্রের পোষাক নয়, শস্যের ইছামতী আলোয় ছেঁড়া তালি জামা বেকারের উৎসবে। কর্মের সাথে ঘর্মের অভিক্ষেপন ক্ষুধা আর মৃত্যুকে নিয়ে এলিয়ে পড়েছে। গীতাঞ্জলির রবীন্দ্রনাথ মনে পড়ে ----
" রাখো রে ধ্যান,থাক রে ফুলের ডালি,
ছিঁড়ুক বস্ত্র, লাগুক ধুলাবালি -----
কর্মযোগে তাঁর সাথে এক হয়ে ঘর্ম পড়ুক ঝরে।"
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের strong willও বলে ওঠে ---
" আমি কবি ভাই কামারের আর কাঁসারির 
               আর ছুতোরের, মুটে মজুরের,
                 ----আমি কবি যত ইতরের।"
কবি আনন্দময় জীবনের সন্ধানে কর্মের উপাসনা ও শান্তির সাধনার আশানৈরাশ্যের সীমা চিহ্ন মিলিয়ে দেন। এখানেই কবি সেরাটোনিন বা হ্যাপি হরমোন ভরা বিদ্যুৎ সময়ের ভ্রমরের মতো সারা অঙ্গে বেঁধে দেন সুর। এ তো সময়ের উত্তরাধিকার। এ তো আনন্দের অনুভবে হৃদয়ের শাশ্বত বিস্ময় !
" তবু সেই সামান্য মানুষ 
সেখানেই হেঁটে চলে যায়,
             কল্লোলিত ইতিহাস পায়ে পায়ে জাগে।
             অন্ধ মন আলো পায়,
স্পর্শে তার ছিঁড়ে যায় সত্য ও অলীক 
           দলিতের সমস্ত শৃঙ্খল ।"
 
কবিতা সময়ের দলিল। সময়ই এক অমৃতকে অনেক করে তোলে। আবশ্যক ও অনাবশ্যক, বাক্ ও অবাক্ বাঁধা পড়ে সংকল্পের মুক্তির খেলায়।কবি লিখছেন ---
" জানি--- পামের চারার মধ্যে সংগোপন আছে অরণ্য;
কাঠের টবে একদিন তাকে ধরবে না !
কাঠের টুলে নিঃসঙ্গ জনতা আছে থেমে 
স্তব্ধ হয়ে;
একদিন তার স্থানুত্ব যাবে ঘুচে।
শুধু কাঠের সিঁড়ি 
কোনদিন পৌঁছাবে না আকাশে।"
কবি বোঝেন  "Everything in life is temporary; change is only constant "।
তাই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর অতুল ঐশ্বর্য নিয়ে  জীবনের পাদপ্রদীপে অন্তর আলোকিত করতে বলেন --- "মানুষ অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে কখন? প্রাণের সঙ্গে বাক্যকে, চক্ষুর সঙ্গে মনকে,স্তোত্রের সঙ্গে আত্মাকে সে যখন মিলিত করে।" ' অপূর্ণতা 'র রসায়নে রহস্য- সত্তায় সবিস্ময়ে মুখ তোলে বিহ্বল মহিমা।
" নিখিল ভুবন ভরি' খেলিতেছে কাঁদিবার খেলা 
অনাদি অতীত কাল ধরি'।
         বিস্ময়ে চাহিয়া দেখি,
         সে খেলায় মাতি'
         কোথায় নেমেছো তুমি মোর সাথে ---
          জঘন্য পাপের মাঝে, বীভৎস ক্ষুধায়,
           অসহ্য গ্লানির পঙ্কে,
           পুতি গন্ধভরা, অচিন্ত্য কলুষে হীনতায় ! "
সেইজন্যই কি বারবার ফিরে আসতে চাওয়া? শুচিস্নানের ব্যাকুলতায়? দেবদারু যেখানে প্রণত হয় কপালে শ্রদ্ধার চুমুতে! ধম্মপদে বলা হয়েছে ,এই দেহজগৎ বিবিধ অলংকারে অলংকৃত রাজপথের ন্যায় --- সময়ের সাথে দেহের ভঙ্গুরতা যে শুধুই বাইরের। রক্তে, মাংসে,মেদে,মজ্জায়, অস্থিতে গড়া এই দেহের সৌন্দর্য গৌড়সারঙের আলাপ মাত্র --
"এথ পস্সিথিমং লোকং চিত্তং রাজরথূপমং।
যথ্থ বালা বিসীদন্তি নথ্থি সঙ্গে বিজানতং।"
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের mind hacking তাই পাঠককে নিয়ে ফেলে ডানার অটুট বিশ্বাসে।
" ফের যদি ফিরে আসি,
আরো আলো চক্ষে যেন আসি নিয়ে,
বুকে আরো প্রেম যেন আনি 
পৃথিবীকে আরো যেন ভালো লাগে।
এবারের মতো ভুল ভ্রান্তি 
স্খলন পতন 
ক্ষমায় ভুলিয়া আসি ;
আরো আনি পথের পাথেয় 
আনন্দ অক্ষয় !"
বাসনার ডালপালায়  বাসা বাঁধতে থাকা মৃত্যু কবির ডোরাকাটা স্বাতন্ত্র্যে চিরন্তনের অন্তর্লীন নিয়তির নিক্কনে আত্মস্থিতিতে ।
" হয়ত হবে না যাওয়া।
ক' বারই বা হয়;
যেতেও চাই কি ঠিক?
যাওয়া নয়,         তারই ছলনা 
ঘড়ি ধরে তৈরি হয়ে 
          শশব্যস্ত বেরিয়ে -পড়া শুধু 
তারপর হয়ত দৈবাৎ 
           প্রতীক্ষার অনিশ্চিত স্টেশনে পৌঁছানো।"
তবুও কবি জানেন ---
" প্রাণের রক্তিম ফুল ফুটে ওঠে মৃত্যুহীন গাছে 
সে মন্ত্র আমার জানা,---তাই মৃত্যু হানো যতবার 
যে জানে প্রাণের মন্ত্র, কতটুকু মৃত্যু তার কাছে।"
                          ( নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী)
Lord Tennyson তার ' Crossing the Bar' এ লিখলেন ---- সূর্য অস্তমিত এবং সন্ধ্যাতারা উদিত। মৃত্যুর ডাক আসছে।অপার সমুদ্রের (মৃত্যুর যাত্রাপথে) দিকে যাবো ---- শোক প্রকাশ কেউ কোরো না।
" Sunset and evening star,
And one clear call for me !
And may there be no meaning of the bar,
When I put out to sea "।
জগতে আনন্দ যজ্ঞে কবি বোঝেন জীবনের নিমন্ত্রণ।
" তুমি কত কিছু দিলে 
তপোদীপ্ত জীবনের সমস্ত বিভূতি;
সূর্যের মতন দিলে সব পরমায়ু 
বিকিরিত প্রেমে করুণায়।"
ভালোবাসার মন্ত্রে দীক্ষিত হতে গোলাপ মেলেন চোখে। কানে কানে পাতেন ফিসফিস। বুকের ক্যানভাসে আঁকতে থাকেন লাল ঠোঁটের কামনা। কাঁচুলির বাঁধন খুলে ছড়িয়ে দেন স্বাধীনতার সাঁকো। অভিমন্যুর স্বপ্ন,  উত্তরার আকাশজোড়া বিষাদ নীলের ডাঙ্গায় শ্বেত - করবীর ডালি নিয়ে দাঁড়িয়ে চোখের কালি মুছতে। " Eres mia, eres mia"---- তুমি আমারই, তুমি আমারই। ভালোবাসার এই পাণ সুপারি কবির 'অ্যাফ্রোডিসিয়াক '( যা খেলে মনে ভালোবাসার উদ্রেক হয়)  হয়ে উঠলে বিসমিল্লার সুর গীতগোবিন্দের রাধা- প্রেম হয়ে আছড়ে পড়ে ----
" রতিগৃহজঘনে বিপুলাপঘনে মনসিজকনকাসনে
মণিময়রসনং তোরণহসনং বিকিরতি কৃতবাসনে।।"
( শ্রীহরি পরিয়ে দিচ্ছেন স্বর্ণকাঞ্চী
নায়িকার সঘন জঘন দেশে,
সে তো জঘন নয়,
সে যে রতির ঘরে মদনের কনকাসন।
তোরণে মঙ্গলমালার মতো 
দোলে সে কনককাঞ্চী ।।)
অন্ধকার বুকে শুভ্র হাসির দ্যোতনাই কবির কবিতার ক্লোরোফিল। জীবন ও মৃত্যুর সম্পর্কে যেন তিনি আলো আর অন্ধকারের রূপ দেখেন।
শিমূলগাছ ভালোবেসে তাই হারিয়ে যেতে চান আকাশের বেলা কাটে যেখানে।
" জানা না -জানার চেয়ে চায় কোনো 
                       অন্য উত্তরণ ! "
এ উত্তরণ কি আত্মোপলব্ধি? এ উত্তরণ কি ভিতর - জাগরণের? ছায়া জড়ানো জীবন থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো সমীকরণের খোঁজ? Narcissism বা আত্মপ্রীতি কি তাহলে চিরজানা প্রতীক্ষার প্রস্তুতি? কবি গণেশ বসুর মতো কবির চিন্তার চিতায় আদগ্ধ আদিম বাসর ---
"নিজের মুখোমুখি দাঁড়ালে প্রতারণা 
অন্ধতা আরো গভীরতর 
হাতের নদী এবং পাহাড়গুলোয় সূর্য বিবর্ণ ---
মৃত চিন্তা এবং পাশুটে চুলের মতো 
রক্তহীন।
.......       .........        ...........
এখন কে যেন আমার কন্ঠরোধ করে,কে যেন 
রাত্রির নিঃসঙ্গতায় বাঁধতে চায়। প্রতিদিন 
ভোরের নির্জনে কংকালের মন্ত্রোচ্চারণ।"
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের ধ্বনি হৃদয় ব্যস্ততায় নয়, পরম প্রহেলিকায়  "মৃত্যু জীবনের শেষ সার আবিস্কার / আর শিব নীলকন্ঠ " জেনে অপরাজিতার মতো গাঢ় নীল সত্যকে আলিঙ্গন করে বলে ওঠেন মাটির রসায়ন ও বুকের রসে ভেজা শাশ্বত জীবনের আলোর প্রণাম মন্ত্র ----
" নমো নমো নমো !
প্রণামের বিরাট আকাশে 
সব গান ডুবে আছে,       মিলে আছে সব পূজা,
হারাইয়া আছে স্তুতি সকল আরতি 
              সমস্ত সাধনা,
কোটি কোটি তারকার মতো।
মহা নীলাকাশসম 
মূর্তিমান সীমাহীন 
নমো নমো নমো ! "
 
             **********

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কবি চন্দন রায়ের কবিতা সংকলনের রিভিউ

কবিতা: নাছোড় বৃষ্টি