ঘিরে থাকে যারা আমার যাপনকে

রবীন্দ্রনাথ আমাদের বাড়িতে থাকতেন
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়

আমার ছেলেবেলা মানে রবীন্দ্র জারণের সময়। খুব ছোট্ট বয়সেই শুনতে থাকি, আমাদের বাড়ি শান্তিনিকেতন। চারদিকে সবুজ।আম, পেয়ারা,কাঁঠাল,লেবু,সুপারি দুলে দুলে জানান দেয় তাদের অস্তিত্ব। মায়ের মারের হাত থেকে বাঁচতে ছুটে পেয়ারা গাছে।আম, কাঁঠাল আমার দস্যিপণায় মুচকি হাসতো খুব।অতো বড়ো বাড়িতে মাঝে মাঝেই আমার চলতো দৌড়,দৌড়,দৌড়।একা একা। মায়ের হাসি তখন বাঁধ ভেঙেছে। মায়ের 'কিচেন গার্ডেনে' তখন ঢ্যাঁড়স, বেগুন, লঙ্কা, ঝিঙে, পুঁই,কুমড়ো আপন ছন্দে পরমানন্দে।বাবা বলতেন,মা ধরিত্রী কন্যা যেন।যাই পোঁতে মাটিতে ,তাই আকাশ পানে উর্দ্ধবাহু। সবুজ মানবী যেন।এক কোণে করবী দাঁড়িয়ে।দরজায় মাথায় বেগনভেলিয়া (কাগজ ফুল) বেশ পা ছড়িয়ে বসে।তুলসী মঞ্চে সন্ধ্যায় জ্বলে প্রদীপ।নিকানো উঠোনে মায়ের হাতের আলপনা।এক অদ্ভুত ভালোলাগার চাদর ছড়িয়ে সারা বাড়ি জুড়ে।অভাব থাকলেও তা পাত্তা পায় না আমার এই শান্তিনিকেতনে।
রাত্রে পড়া হয়ে গেলে উঠোনে খাটিয়ায় শুয়ে মায়ের গলায় গান।মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে সেই বয়সেই দাড়িদাদুর জন্য কেমন এক ভালোবাসা। গানের মানে বুঝতাম না, কিন্ত এটুকু বুঝতে পারতাম ওনার গান শুনলেই ভেতর ঘরে কেমন যেন একটা নদী বয়ে যায়। নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে একা চলে নদী। গান গাইতে গাইতে মায়ের বুঁজে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতাম কেমন যেন এক আলো ! আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতাম ,তারারা মুচকি হাসছে। ওরাও কি মায়ের গান শুনতে পাচ্ছে?  মায়ের গলায় তখন একে একে আসছে " তোমায় গান শোনাবো" বা " এসেছিলে তবু আসো নাই/ জানায়ে গেলে", বা " আমার রাত পোহালো " । গানগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। প্রায়ই শোনার কারণে আমার বেসুরো গলাতেও কখন যেন হয়ে গেল দাড়িদাদুর স্থায়ী ঠিকানা । আনন্দ বাঁধন ছাড়া হতো মা যখন " আনন্দলোকে মঙগলালোকে" গাইতেন।পরে একটু বড়ো হয়ে মাউথ অর্গানে প্রথম বাজাই ঐ গানটাই। সত্যিই আনন্দলোক ছিল আমার সেই ছেলেবেলার শান্তিনিকেতন।
আজ ২৫ শে বৈশাখ হলেই ঐ দুজন আমার বুক জুড়ে। আমার দুই ঈশ্বর।দুই প্রাণের ঠাকুর। মায়ের হাত ধরেই আমার রবীন্দ্রনাথ চেনা।তার গান, গল্প মা এতো সাবলীল বলে যেতেন যে মনে হতো মা যেন শান্তিনিকেতনের ছাতিম তলায় বা উপাসনাগৃহের সামনে বসে।অথচ মা কোনদিনও শান্তিনিকেতন যাননি।দাদুর সে সামর্থ্য ছিলও না।পরে জেনেছিলাম মা বই পড়ে, রেডিও শুনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বুকে রোপন করেন।আজ এতোটা বয়সে এসে সত্যিই বিস্ময় জাগে  ! কতোখানি ভালোবাসা থাকলে এটা সম্ভব !
  বড়ো হয়ে জেনেছিলাম ঠাকুরের স্বপ্নের আশ্রয় বোলপুরের শান্তিনিকেতনের নাম।গিয়েছি কতোবার ! ছাতিমতলা, উপাসনা গৃহের সামনে বসলে বা শান্তিনিকেতনের আনাচে কানাচে ঘোরাঘুরি করলে মা যেন আমার হাত ধরে হেঁটে চলেন আজও।মা আজ আমার কাছে নেই।মেঘ হয়ে ভেসে বেড়ায় এদিক ওদিক। অথবা রাতের তারা হয়ে গান গায়" আকাশ ভরা সূর্য তারা/ বিশ্বভরা প্রাণ" !
রবীন্দ্রনাথ বুকে এলেই সঙ্গে আসে আমার মায়ের গায়ের গন্ধটা। দুজন ঈশ্বর কখন যেন তখন একাকার হয়ে যায় আমাকে পাগল করে। ছেলেবেলায় মাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোথায় থাকেন জিজ্ঞাসা করলেই মা বলতো :" এখানে..... এই বাড়িতেই, এই সবুজেই.....আমাদেরই কাছে" । তখন যেন শান্তিনিকেতন হয়ে উঠতো আমার বাড়ি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থাকতেন আমার 'নমিতা আশ্রম'এ !!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার দ্রুতি ও মন্দন

কবি চন্দন রায়ের কবিতা সংকলনের রিভিউ

কবিতা: নাছোড় বৃষ্টি