কবি শুভদীপ দে র কবিতা সংকলনের পাঠ প্রতিক্রিয়া
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
বুকের নিকোনো উঠোনের আলপনায় সে জেগে থাকে
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
উত্তরপাড়া, হুগলি
প্রকাশক প্রিয় ধীমান ব্রম্ভ্রচারীর 'এবং অধ্যায় ' প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত সবুজ সৌভিক কবি শুভদীপ দে র কবিতার বই ' মানচিত্র কখনও দেশ হতে পারে না 'য় দেশভাগের যন্ত্রণা ও তার মন্থণে উৎসারিত গরল কবির কবিতাকে এক করুণ রাগে প্রদৃপ্ত করে তুলেছে।দেশ মানে শুধু" মৃৎপিন্ড জলরেখয়া বলয়িতঃ" নয়, দেশ মানে বুকভরা আবেগের এসরেণু যেখানে নিকোনো উঠোনে খেলে বেড়ায় সমাঘ্রাত ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে।শুরুর শুরুটা শুরু করার শুরুতেই কবির কথায় বলা যায় :"দেশ মানে শাসন, শোষণ,নীতি, রীতি ছাড়াও অব্যক্ত অনেক কথা। আবেগ, কান্না, উচ্ছাস কিংবা ভেঙে যাওয়া শেষ চৈত্রের বেড়া।" এই বেড়া ভেঙে জীবনের কষ্টের ভাওলি খুঁজে ফেরেন কবি শুভদীপ তার অনন্য সৃজনে। কবিতার অক্ষরে অক্ষরে যেন জীবনানন্দ দাশের প্লাবন ---
"রয়েছি সবুজ মাঠে ---ঘাসে----
আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে
আকাশে;
জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়
এই সব ছুঁয়ে ছেনে !--- সে এক বিস্ময় "
প্রথম কবিতা ' সিঁদুর কৌটো 'তেই কবি তার শব্দ যাত্রার গতিপথের মানচিত্র এঁকে দেন সিগনেচার ষ্টাইলে -----
"সব ফেলে রেখে চলে যাব
সব সব
টিনের বাক্স, চিলেকোঠা, বরগা,বারান্দা
ভাঙা পাঁচিলের গায়ে গজিয়ে ওঠা বটগাছ।
ফেলে যাব ----
কাগজ, ছেঁড়া দলিল,দাদুর ভাঙা চশমাও...."
এক নক্ষত্র বুনন।ইমেজারি ব্যবহারে কবিতায় একটা দৃশ্যকল্প রচনা করেন কবি কিলকিঞ্চিত অনুভবে। বেদনার হিম কমলালেবুর করুণ মাংস যেন কবি রাখলেন কোনো এক পরিচিত মুমূর্ষুর বিছানার পাশে।এর পরই কবিতার discourse বদলে গেল শেষে এসে ---
" শুধু নিয়ে যাব
তোমার সিঁদুর কৌটো
যা ফেলে এসেছিলাম
দেশভাগের আগে বাঁধানো ঠাকুরঘরে।"
পাঠক চমকে ওঠেন এক অপ্রত্যাশিত ভালোবাসার অভিঘাতে। কবি রুদ্র গোস্বামীর কবিতার সুর যেন এখানে ----
" পৃথিবীতে কেউ একা নয়,
কেউ সুখ অথবা কেউ না পাওয়ায় সাথী
সুখ এলো না?
কী আসে যায় ,!
জীবনে এখনো বহু বাঁচা আছে বাকি।"
সিঁদুর কৌটো যেন সেই বাকি বহু বাঁচার প্রতীক। কবি শুভদীপের কলম এ জায়গায় এসে শ্রদ্ধেয় কবি আল মাহমুদ অভিসারী ----
" কবির কাজ স্বপ্ন দেখানো, আমি এই জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছি।" বাঁচার স্বপ্ন শুভদীপের অক্ষরমালায়।
' সীমান্ত থেকে বলছি ' এক অদ্ভুত ব্যঞ্জনার দ্যোতনা । Shakespeare এর ' The Tempest ' মনে পড়ে --
"We are such stuff as dreams are made on" ----
"নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাবার আগে
দু-টুকরো ওম রেখে যাও ....
ওদের চোখের জল
বৃষ্টি ধুয়ে দিয়েছে কাল ভোররাতে।'
Creative imagination দরজা খুলে দেয় পাঠকের কাছে পাঠক যেখানে "tends to objectize itself and to know itself in the object "। কবি পৃথিবীতে অপব্যয়ী অক্লান্ত দুঃখের মাঝে এক পাওয়ার আগুন জ্বালাতে চান অন্ধকারের দুয়ার খুলে সপ্রতিভ হাতে যেখানে চঞ্চল চোখের জল স্তব্ধ হয়ে কাঁপায় পাঠকের হৃদয়।
হেমন্তের শুকনো পাতার দাবানলও কবির চোখে আলোর ঈশ্বর হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ বুকের গানে নিশীথের বাতাসের মতো ----
"পাতা খসা অসাড় হেমন্তদিন
একই সাথে সুন্দর ও শুকনো,
দাবানল লাগলে ওই বনাঞ্চলও
ঈশ্বর হয়ে ওঠে।"
কবির ঈশ্বর এখানে রোমান্টিসিজমের যেন এক চূড়ান্ত রূপ -- মুক্তির খোঁজ আলোয় আলোয়, অন্ধকারের সব প্রতিবিম্ব সব বেদনার স্তর সরিয়ে না - ফুরানো ভালোবাসার জন্মে জন্মে।Pablo Neruda এখানেই ধূপের মতো গন্ধ বিলোন ----
"As if you were on fire from
Within,
The moon lives in the living of
Your skin "।
এক ঘোরলাগা বোধের বিকুলি কবিকে প্রাণের কাছে টেনে আনে, সেইসঙ্গে পাঠককেও।বিক্লবতায় পাঠক পড়ে চলেন ' পৃথিবীর মন ভালো নেই ' ,' আমার দেশ এক সরলরেখায় দাঁড়িয়ে' প্রভৃতি কবিতা।
' চাঁদের আলো ছাড়া সব মিথ্যা ' কবিতায় কবি কঠিন সময়কে ধরার চেষ্টা করেছেন contrast এর রূপরেখায় --
"আমাদের চেতনা হয়নি বলে
সেই যে জ্যাঠামশাই ছেড়ে চলে গিয়েছিল
বাগানে কলমি শাক হচ্ছে দেখে
আবার ফিরছে।"
তবে
বড় কঠিন সময় জ্যাঠামশাই !
অন্ধকার হাতড়াচ্ছি,
চাঁদের আলো ছাড়া বাকি সব মিথ্যা।"
চাঁদের আলোয় ভাসতে থাকা পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে শুভদীপ জীবনানন্দ হাতড়ান ----
" পৃথিবীর গভীর গভীরতম অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।"
একটা অসহায়তা গ্ৰাস করে। তবে মুক্তির উপায়? কবির কথায় জাগতে হবে, জাগাতে হবে। মানুষের সাথে পথ চলতে হবে। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
আর? কবিতায় জ্বালতে হবে আগুন।Lord Byron যেমন বলেছিলেন: " A drop of ink may make a million think ."
' এখনও সব কলম বিক্রি হয়ে যায়নি ' কবিতায় কবির সন্দীপন ---
" এখনও সব কলম বিক্রি হয়ে যায়নি
তাই রাষ্ট্র ভয় পায়।
চার দেওয়াল তুলে
আটকে রাখতে চায় কলমকে !"
সারা দেশে লক ডাউন পিরিয়ডের যন্ত্রণা কবিকে ক্রুদ্ধ করে তোলে।নগ্ন পায়ে খিদের ঈশ্বর হেঁটে চলেন ' আমার দেশ হাঁটছে ' কবিতায় ----
"আমার দেশ হাঁটছে,
হাঁটতে হাঁটতে পা ফেটে রক্ত....
রক্তে চ্যাটচ্যাট করছে সোনালি চতুর্ভূজ।
মহানগর থেকে গ্ৰামে আসছে আমার দেশ।"
" এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না ", কবি বলতে চাইলেন।Garcia Lorca র কথা কবির মূল সুর : " I will always be on the side of those
Who have nothing and who are not
even allowed to enjoy the nothing
they have in peace !'
এক মর্মন্তুদ চিত্রকল্প কবি আঁকলেন তার ' আমার দেশ ' কবিতায় ----
" সকাল থেকেই গৃহবন্দী
বন্ ধ চলছে।
মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ -সহ আরও তেরো দফা
নব্বই ছুঁই ছুঁই আমার ঠাকুরদার
ঝাপসা দৃষ্টি জানালায়....
দু-এক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়েছে হয়তো।"
শীতল চাঁদের মতো শিশিরের ভেজা স্বপ্ন নয়, কষ্টের কান্নার পথ ধরে পাঠক চলেন দিনের আলোয় তার দেশ মার সঙ্গে নীলকন্ঠ হয়ে আগুন জ্বালাবে বলে অন্ধকারে ডুবে থাকা সময় সরিয়ে।
বইটির সিগনেচার কবিতা ' মানচিত্র কখনও দেশ হতে পারে না '----
" মানচিত্র কখনও দেশ হতে পারে না,
দেশ হল তোমার পাশের বাড়ি,
দেশ হল বন্ধ চা বাগান।
........ ........ ........
দেশের কোনো সীমানা হয় না,
পাঁচিলশূণ্য একটা ভূখন্ডের
নামই তো দেশ।"
সীমানাহীন এক মাটির আকাশ হলো দেশ।
ভালোবাসা মোড়া যাপনের হাত ধরাধরি হলো দেশ।
দিনের আলোর বাস্তবতার পর রাতের নক্ষত্রঘেরা চাঁদসিক্ত আলিঙ্গন হলো দেশ।
কষ্ট নয়, সুখের চাদরে অপত্য জারণের নামই দেশ।
কবি শুভদীপের কলম শব্দ অভিসারী। কবিতার বিনির্মাণে এক সচেতন প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। তবে আরো পথ চলা বাকি। কবির আগামীর অক্ষরযাপন গভীর সবুজ ঘাস, ঘাসের ফড়িংএ ঢেকে থাকুক, চিন্তা আর জিজ্ঞাসার আলোকিত স্বাদ তার স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পাক।' কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'জল সইতে'র মতো কবিতা সইতে চলুন কবি শুভদীপ নান্দনিক রোমান্টিসিজমে.....
" দেখে যাতে তোমাদের কষ্ট না হয়
চোখে যাতে ভালো লাগে
তার জন্যে
আমার বুকে - বেঁধানো সমস্ত কাঁটায়
আমি গুজে দিয়েছি
একটি করে ফুল
তোমরা হাসো।"
*************
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন