কবি মধুসূদন দরিপার কবিতা সংকলনের পাঠ প্রতিক্রিয়া


       " কবিতার মুখোমুখি দেবাশীষ "


" জীবনের বাঁশির দীর্ঘশ্বাসে ব্যাকুল বিদায়ের সুর "
            ---------------------------------------


               দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
                  উত্তরপাড়া, হুগলি 



" মানুষের মুখ দেখি
জড়দের মুখ দেখি
মানুষ জড়ের মতো হয়
এই সত্য জানি

জড় কী মানুষ হয়?
এই সত্য জানে যারা
সপ্তরথী হয়ে তারা
প্রতিদিন সূর্যের রথ টেনে যায়"
অদ্বৈত বেদান্তের মতে দৃশ্য ও দ্রষ্টা আলাদা। শরীর মন হল দৃশ্য।যা অনুভব করছি, দেখতে পাচ্ছি , তাই দৃশ্য।আর আত্মা চেতন--- চৈতন্য বা ব্রম্ভ। " সর্বং খল্বিদং ব্রম্ভ"।সমস্ত দৃশ্যবস্তু ব্রম্ভময়।
সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত ' অস্তরাগ' কবিতা সংকলনে শ্রদ্ধেয় কবি মধুসূদন দরিপার শব্দ আরতিতে কোথায় যেন স্কিচজোফ্রেনিয়া বা ঈশ্বর সঙ্কল্প ছুঁয়ে যায় সাংখ্য -যোগ----
"ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্
       নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
         ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।"

" রেতঃ শরীরে ভাসে ক্ষিতি
পাথঃ শরীরে ভাসে অপর
জ্যোতি ঃ শরীরে ভাসে তেজ
বায়ুঃ শরীরে ভাসে মরুৎ
নভঃ শরীরে ভাসে ব্যোম্

পঞ্চভূত হে জীবন
ঋণ রয়ে গেল চেতনায়
ক্ষমা করে দিও "
ধীরে ধীরে আত্মজ্ঞান লাভের আকাঙ্খা, যাকে divine discontent  বলে --তার তীব্র ব্যাকুলতা 
লাভের ইচ্ছা অতিবাদী হয়ে দাঁড়ায় ' অস্তরাগ' এর মূল স্রোত।

Rattle -snake বড়ো বিষাক্ত সাপ। ভগবানের অদ্ভুত সৃষ্টি, তার ল্যাজে ঝুমঝুমির আওয়াজ দিয়েছেন মানুষ বা অন্য কোন প্রাণীকে সতর্ক করতে যে ঐ সাপ আসছে। মৃত্যুর আসাও যেন জীবন বুঝতে থাকে পরিত্যক্ত বাদামের মতো সময়ের উচ্ছিষ্ট খোলায়। এবং এটাই যথাযথ --মৃত্যুও তো হৃৎপিণ্ডের প্রতিধ্বনি।

কবি লিখছেন ---
" জল কমে আসে রোজ
কমে আসে জলস্রোত
এবার ভাঙ্গতে হবে ডাঙ্গা
ভুবনডাঙ্গার বিপরীতে তার বাস"
এবার যেতে হবে।জল কমে আসে রোজ।" মৃত্যু সে তো জীবনর চেয়ে ঢ্যাঙ্গা নয়"। তবে কেন এতো  জীবনের নিকশী কাঁথা বোনা দুঃখ সুখের প্রলাপে?শেষের সেদিনের দিকে এগিয়ে চলা তাই কবির শব্দের আলোয় এক নতুন মেটাফর -----
" করো আশীর্বাদ
যখনি তোমার দূত আনিবে সংবাদ
তখনি তোমার কার্যে আনন্দিত মনে
সব ছাড়ি যেতে পারি দুঃখে ও মরণে।"

কবি মধুসূদন দরিপা ঝলসিত বুকের শ্লেষ্মায় দুঃস্বপ্ন - মথিত রক্তমাখা ক্ষত - রসায়নে  জারিত করেন পাঠককে তার বেগমান অভিঘাত চেতনায় ----
" এ সময় পিছু ডাকতে নেই
দেখছ না যে পথে চলেছি হেঁটে
তার কোন দিশা নেই
ভুলে গেছ একদিন ইশারায়
তুমিই লিখে দিয়েছিলে
এ পথের ঠিকানা "
রুদ্র মহম্মদ শহীদুল্লাহ তরঙ্গময় মানুষিক মস্তিষ্কে ভরে নিতে বলেন সার সত্য ----
" এবং জন্ম মানেই মৃত্যুর প্রতি অমোঘ যাত্রা ।"

কবি মধুসূদন দরিপার মতে,চলে যাওয়া মানে বিচ্ছেদ নয় -- চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা নোনা জলের স্মৃতির পথে একৈক এক বিবিক্ত একতাল মাংস শুধু। Hamlet জেগে থাকে তাই অনিদ্রার রাতে ----
" To die, to sleep ---
To sleep,perchance to dream ----ay,
there's the rub.
For in this sleep of death what
dreams may come...."

তবুও রঙিন ফুলেরই নির্মঞ্জন কবির ।গোলাপের ছাইয়ের আশ্রয়েও বলে যান ----
" পরজন্মে জলজন্ম দিও
পথে পথে এঁকে যাব জলরেখা
মুখে মুখে জলবিভাজিকা
পাখিদের ওষ্ঠাধর ভেজা
অজস্র চুমা"
Tennyson জীবনকে বিষম সুদূর ধু-ধু অন্তরালে শূণ্য ক্যানভাস হিসেবে দেখেননি, ধোপদুরস্ত পোষাকে ক্লীন সেভড্ ফিটফাট এক হ্রাদ যেন জীবন তার কাছে-----
"I will drink life to the lees"।

কবি মধুসূদন দরিপার কবিতা এক বোধের উন্মেষ ঘটায় পাঠক চিত্তে। বয়সের অভিজ্ঞতা ও চিন্তন মৃত্যুর পাশে জীবনকে সাজায় বসন্তে নব নব পল্লবে পল্লবে । মৃত্যুর রেলিঙে ঝুঁকে জীবনের নিশান উড়িয়ে দেন বাকি থাকা দিনের মায়ায়।"Apres moi de deluge?"--আমার পরে তবে কি সব শেষ?---- এসব ভাবনার উর্দ্ধে উঠে যেন বলতে চান " If death be sweeter, let me die"।
কবি লিখছেন ---
" বুড়ি ছোঁয়ার সময় এগিয়ে এলে
মানুষ কচ্ছপের মতো শ্লথ হয়ে যায়
খরগোশ দৌড় থামিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে যথারীতি
সে না চাইলেও বুড়ি তাকে ছুঁয়ে ফেলে ঠিক

বুড়ি ছোঁয়ার গন্ধ নাকে এলে
মানুষ মরীয়া হয়ে ওঠে
কচ্ছপের খোলস ভেঙে সে তখন
হরিণের মতো ছুটতে থাকে"

মির্জা গালিব একসময় লিখলেন ---
" মওত ইক ঠন্ডী সী চুবন --
জিসকী ইয়াদ আতে হী ইনসান ভুল যাতে হ্যায়
ইস ্ দুনিয়া কী গম্।" মৃত্যুর শীতল চুম্বন, এ কথা স্মরণে এলেই মানুষ ভুলে যায় এ দুনিয়ায় দুঃখ বেদনার কথা।কবি মধুসূদন দরিপার একই অনুভবের প্রতিধ্বনি কেঁপে ওঠা বিষুবরেখায়---
" মৃত্যুকে বন্ধু মনে হয় এই বেলা
তার সাথে কথা হয় রোজ
সে সব সান্ধ্যভাষা সাংকেতিক সব
ইশারায় বুঝে নিতে হয়

আলো নয় অন্ধকারে তার
মুখ দেখা যায় "

কবির train of thought জীবন মৃত্যুর দাবা খেলার সমীকরণ । স্তনের শঙ্খে মুখ রেখে বুকে চিতার চন্দন সুগন্ধের সন্ধান। ' অস্তরাগ' এ এসে কবির কলমের একটা বাঁক লক্ষ্য করা যায়।
" মৃত্যুরে বন্ধুর মত ডেকেছি তো ---প্রিয়ার মতন!
চকিত শিশুর মত তার কোলে লুকায়েছি মুখ।"
ভগ্নস্তূপে ধ্বংসচিহ্ন খোঁজা নয়, কতিপয় পোড়া কলঙ্কিত ইঁটের আর্তনাদ নয়, বুকে হিম নিয়ে নির্বান্ধব অহংকার নয় -- কবি লিখছেন ' চতুর্থ প্রহর '----
 " আলো ছায়া রোদ মায়া
জল বায়ু গাছ মাটি
পাখি পশু নর নারী শিশু
নষ্ট করেছি সব
নষ্টকাল তিন কাল
ধীর পায়ে আসে চতুর্থ প্রহর
অন্তর আসীন হে যোগীবর
জেগে ওঠো এইবার"।

রোদ কমে আসছে।পড়ন্ত বেলায় এসে মনে জাগে " এ সময় হে জীবন ধন্য হও
গায়ত্রী সংগীতে
পূর্ণ হও পুণ্য উচ্চারণে
মৃতোর্মামৃতংগময়।"
মৃত্যুর গায়ে গা লাগিয়ে এই " প্রলয়পয়োধিজলে ভেসে থাকা/ তিন ভাগ জলের জীবন "এর অনুভব নিয়ে কবি যেন আশার ইস্তাহার বিলি করেন অলিতে গলিতে শান্তির অক্ষয় অধিকারে এ অগাধ জীবন ছেড়ে মাটির ' ভূমায় '---          "এ দ্যুলোক মধুময়       মধুময় পৃথিবীর ধূলি।"


                 ******************
লেখক : দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
ঠিকানা : উত্তরপাড়া, হুগলি, পিন :৭১২২৫৮
মুঠোফোন : ৯১২৩৮৪৪২৭৭

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার দ্রুতি ও মন্দন

কবি চন্দন রায়ের কবিতা সংকলনের রিভিউ

কবিতা: নাছোড় বৃষ্টি