কবি নন্দিনী সরকারের কবিতা সংকলনের পাঠ প্রতিক্রিয়া
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
" কবিতার মুখোমুখি দেবাশীষ"
-------------------
আশাবরী রাগে বাজে প্রাণের ছন্দ
-------------------------------
দেবাশীষ মুখোপাধ্যায়
উত্তরপাড়া, হুগলি
******
" খুঁজতে ভারি বয়েই গেছে
হারিয়ে নতুন সুখ!
আপন মনে আপনি থাকা
ভাবনাতে ধুকপুক।
পলক ফেলার সাথেই হারায়
ভবের কিছু ' ক্ষণ'
মহাকাশে নেই সে হিসেব
এখন তখন।"
কবি নন্দিনী সরকারের কবিতা আয়নায় সদ্ বিম্ব যা চিরকালের দাবি নিয়ে আসে।মানব দীঘির জলে ঝলক ঝলে মাণিক হীরা বোবা ভাষায় যা সৃষ্টির তলে ভালোবাসার চিদাম্বরে দীক্ষিত। হালকা ক্ষীণ জীবনের ঢেউ ভেতরে খিলখিল করে হেসে চলে আমার আমির রঙ মেখে।Charles Baudelaire মনে পড়ে ----
" Whenever I am NOT is the place where I am myself".সংহত নিবিড় অভিজ্ঞান শাদা নরম অক্ষরে বলে যায় মুহূর্তের পর মুহূর্তের ছলনা যাকে অতিরিক্তের রিক্ততায় কাগজের মতো টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দেন কবি কুয়াশার মিছিলে।।দুঃস্বপ্নের খোলস ভাঙতে থাকে নতুন জীবনের , খোঁজ চলে সেই 'আমি' নামক চালকের যেখানে অলখ সাঁই সচ্চিদানন্দের ' অনামক ' ।
' রণসৃজ পাবলিকেশন ' থেকে প্রকাশিত প্রিয় কবি নন্দিনী সরকারের কবিতা সংকলন ' দুঃস্বপ্নের খোলস ভাঙে ' এক অস্ফুট আলো যেখানে মন কৃপণতার ভৌতিক স্তব্ধতা এড়িয়ে রাজপথে ওড়ায় প্রাণের বুদবুদ অস্থির আগ্ৰহে।অমলকান্তির রোদ্দুর হওয়ার স্বপ্ন যেখানে আছড়ে পড়ে এক আলোর মন্ত্র হয়ে, স্বাধীনতার শপথ দৃঢ় করতে থাকে হৃদয়ের জাগ্ৰত কাঁপন,জীবন ও মৃত্যু এক সরলরেখায় দাঁড়িয়ে একে অপরকে উষ্ণ আলিঙ্গনে পিঠ চাপড়ে দেয় ।কবিতায় শব্দরা আগাগোড়া সুসংহত। Over -wordification নেই। কবিতার অনুভবে যেমন প্রয়োজন শব্দরা তেমনই এসেছে রোদ্দুরের চুমু দিয়ে শিশিরের গালে ,পথের রুক্ষতায় সুখশয্যা পেতে শরীরী আলপনায় কাঙাল প্রাণে ইচ্ছার সুখের আগুন ঢেলে। একটা suggestiveness কবিতার প্রাণ ভোমরা আলুলায়িত চুলের মতো। রূপকথার আলাপন বুকের সাঁকো পেরিয়ে রণক্লান্ত চোখে মাখছে প্রযত মাসকারা প্রাণের উল্লোলে।
কবি জীবনের ছোট ছোট আনন্দকে চেটে খাবার সুখ খুঁজতে 'ভাবের কথা ' বলেন ---
" এসো মুখোমুখি বসি,
চাওয়া পাওয়ার হিসেব সরিয়ে
গভীর দৃষ্টিতে তাকাও ----
জীবনের মানে খুঁজি
তোমার চোখে।
বৃষ্টি ঝরুক বুকে
ডিঙি ভাসাই মনে,
মাঝিভাই ছুটি নিক ---
ভাসতে ভাসতে
যাই অচিনপুরের ঘাটে।"
একটা কল্পনামনীষার logocentricism বা ধ্বনি কেন্দ্রিকতা "আত্মস্বরূপম্ "----The light within us - এর দিকে আমাদের নিয়ে চলে ছায়াপথের আনাগোনায় এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের মাধবীলতায়।কবির এ এক পাঠ দান ----
"জীবনের চেনা অচেনাকে মানচিত্রে সাজিয়ে
পথ চলা প্রকৃত আবিস্কার।
জীবনে কিছু স্থায়ী নয় ধরে নিয়ে
আপেক্ষিকতার তত্ত্বে ভর করাই বিশ্বাস।
জীবনের ওঠানামা খেলার অঙ্গ ভাবলে
কত সহজ হয়ে যায় এই লড়াই।"
" সত্যমেব জয়তে নানৃতম্ "। জীবনের লড়াই সত্যকে ছুঁয়েই থাকে, তাকে বারে বারে খুঁজে পেতে হয়।
কবি বিনয় মজুমদার উন্মুক্ত কন্ঠের উচ্চসুরে এখানে ----
"এ সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে
সঞ্চারিত হতে চাই, চিরকাল হতে অভিলাষী,
সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে বলে,
তবুও কেন যে আজো, হায় হাসি, হায় দেবদারু,
মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।"
তরঙ্গের অস্ফুট কল্লোলে জীবন আসলে আলো আর অন্ধকারের দূরত্ব মাপে শুধু, হাসি কান্নার ছদ্মবেশ পাল্টে যায় বহুরূপীর মতো। কালো মেঘের শিখরে উঠতে উঠতে Alexis Carrel এর মতো বোঝা---
"Man cannot remake himself without suffering, for he is both the marble and sculptor".
সবুজের ক্লোরোফিলে প্রজাপতি উড়লে,দোয়েল কোকিল ডাকলে, বট শিরীষ হিজলের ডালপালা মেলে হাসি মুখ। নবজীবনের কাছে সবুজের অঙ্গীকার করতে বসে মধ্যরাতে নদীর কান্নার আওয়াজ তার কানে। প্রতিবাদে চাঁদ বায়বীয় স্লোগান ----
" এখনো ঘটা করে পরিবেশ দিবস হয়
গাছ বসাও জল বাঁচাও ধ্বনি ওঠে
তবু লুকোনো অস্ত্রে শান দিচ্ছে পৃথিবী
প্রতিবাদের ঝড় তুলছে আকাশে বাতাসে
সমঝোতা সহ্য হয় না আর।"
জীবনানন্দের আঁকা মায়াবী প্রকৃতির ভাষা আজ আর মানুষ বোঝে কই? নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায় হাঁটা পা খুঁজে ফেরে গাছের গায়ে জমে থাকা শ্যাওলার গন্ধ ---
" পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;
পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;
পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু' জনার মনে;
আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে আকাশে।"এই ফড়িং চড়ুইয়ের জীবন আর সঙ্গী হয় না এখন। একটা অন্ধকারের বল গড়িয়ে নামতে থাকে গাছেদের শেকড়ে।বৃক্ষ এখনও বাঁচতে চায়, বাঁচাতে চায় মানুষকে তার প্রপঞ্চ ছায়া মেলে সূর্যের সাথে আড়িভাবের খেলায়। কিন্তু.....
প্রশ্নের ফাকতা ডানা ঝাপটায় ----উত্তরের চোখে টলটলে জল। কবির শব্দকল্পদ্রুম ভাবনার ভেতরে স্বপ্নের নিরত্যয়ে -----
"পাহাড় কোলে মেঘের দেশে
বৃষ্টি ছোঁয়া মন
অচিনপুরে গাছের ছায়ায়
হারিয়ে বিচরণ।
বনের খাঁজে ছোট বড়ো
ফুলেরা দল মেলে,
প্রজাপতির পাখায় পাখায়
রেণুর খেলা চলে।"
কোথায় যেন কবির কান্নাভেজা গলায় বলে ওঠা " মাটি, তুমি নাও বুকে মেলে"।
ভালোবাসা কবির চোখে প্রতিধ্বনিময় বিশ্বাস চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।
"ভালো থেকো সুস্থ থেকো
ভাসিয়ে জীবন তরী
দেখতে হবে পরস্পরে
শপথ দৃঢ় করি।"
কবি নির্মলেন্দু গুণ ভালোবাসার ক্রিয়াপদগুলিকে সবুজ আনন্দে উড়িয়ে দেন আবীরের মতো ---
"বুকের কার্নিশে এসে মাঝে - মধ্যে বসো প্রিয়তমা,
এখানে আনন্দ পাবে, পাবে খোলা হাওয়া।"
জীবনের বিষুবরেখায় বাজে উপনিষদের সুর--
" আনন্দ রূপম্ মৃতং যদ্বিভাতি "।এই আনন্দের মাঝেই কবি মৃত্যুকে কাছিমের মতো এগিয়ে আসতে দেখেন --
" হয়ের কথা ভেবে ভেবে জীবন শূণ্য --
লয়ের জন্য তৈরি থাকতে হয়।"
জীবনের নিত্যতা সূত্র ---রঙ ফিকে হতে থাকে, রস নিংড়ে নেয় অভিজ্ঞতা। ঠিক বেঠিকের খেলায় সকাল দুপুর বড়ো জোলো।অভ্যস্ত শরীরের গায়ে আজ চুনবালি খসে পড়ার সাজ।অন্তিমের কথা মনে পড়লে সিগারেট ধরাতে গিয়ে ভেজা দেশলাই তাকিয়ে থাকে বিস্ময়ে অপলক।
" ঠিক বেঠিকের বড়াই করে লড়াই জীবন ভোর
হিসেব নিকেশ সাঙ্গ হবে নামলে ঘুমের ঘোর।"
কবি নন্দিনীর কবিতায় সরলতা বৃষ্টি শেষে নির্বাক আকাশের সাথে উচ্চকিত ঐক্যতানে ব্যাঙেদের ডাক, নারকেলের ঝাঁকড়া মাথায় সোনার আলোর ঝিলিক,ভনিতাহীন চুম্বনের দীপ্ত স্নিগ্ধ চমক, কাঠবিড়ালির লেজের খেলায় কচি পাতার হাসির তুফান, খোলা জানালায় উঁকি মারা সঙ্গমের আগুয়ান ঢেউ।"স্রোতের সেঁওলি"র মতো ভেসে চলে তার কবিতা এক সরল বিনির্মাণে। কবির চেষ্টা আন্তরিক। কিছু কিছু কবিতা সত্যিই পাঠকের মনে পলাশের উল্লাস তৈরি করে।প্রাত্যহিকীর সুখ দুঃখের অবাক খেলায় উত্তরণের অনুভব আশার ভৈরবীর সুরে।Walt Whitman যেন কবিতার হৃৎস্পন্দনে সেই পার্থিব সরলতারই দ্যোতনা ----
" The art of art,the glory of expression and the Sunshine of the light of letters, is simplicity"।এই শিশুর খাদ্যের মতো সহজ তরল সারল্য কবি নন্দিনীর কবিতার মূল স্রোত হয়ে বয়ে যায় এবং ঠিক এখানেই কবির কবিতা পাঠকের বুকে টুপ করে খসে পড়ে সমস্ত দুঃস্বপ্নের ভাঙা চোরা ঢেউ পেরিয়ে আত্মার আত্মীয় হতে মায়াবী প্রাণের বুভুৎসায়।
***********
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন