কবি পিনাকী বসুর কবিতা সংকলন ' সুখ পোড়া গন্ধ ' র পাঠ প্রতিক্রিয়া


       ' কবিতার মুখোমুখি দেবাশীষ '


     ০  দুঃখচোষা অক্টোপাসের গায়ে                             ভালোবাসার কেতকী গন্ধ ০
              ------------------------------

                দেবাশীষ মুখোপাধ্যায় 
                  উত্তরপাড়া, হুগলি 
                       •••••••••••••••


রিক্ত ও অতিরিক্তের দ্বন্দ্ব-যোনিতে তৈরি  গরীবী(Poverty  )পরিমাপের অর্থনীতিতে একটা চালু পদ্ধতি হলো Lorenz curve analysis । একটা আয়তক্ষেত্রের দুই বিপরীত কৌণিক বিন্দুর সংযোজক সরলরেখা যা প্রকৃত ঐ আয়তক্ষেত্রের কর্ণ তাকে ' zero poverty line ' বলে এবং ঐ একই দুই বিন্দুর সংযোজক রেখাকে Lorenz curve বলে যা সাধারণত প্রথম সরলরেখায় তলায় অবস্থান করে।এই দুই রেখার মধ্যের ফাঁক (Gap)দিয়ে poverty measure করা হয় অর্থাৎ যদি রেখা দুটির মাঝে ফাঁক থাকে বেশি তাহলে সে দেশ বেশ গরীব।আর ফাঁক যতো কম হবে গরীবী পরিমাপ তত কম। যদি দুটি রেখা সমাপতিত হয় তাহলে সে দেশ গরীব নয় ধরে নেওয়া হয়।

এই উদাহরণ কবি, কবিতা ও পাঠকের ক্ষেত্রেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ধরা যাক zero poverty line হলো কবির সৃষ্ট কবিতা যা তিনি পাঠকদের সামনে উপস্থাপিত করেছেন।Lorenz curve টি ধরুন কবির সৃষ্ট অনুভব বা বোধ বা চেতন রেখা। যদি দুই রেখার মধ্যে ফাঁক থেকে যায় তাহলে কবির কবিতা পাঠকের ব্ল্যাকবোর্ডের বর্ণমালা হতে সক্ষম হয় না। কিছু অদৃশ্য দূরত্ব রয়ে যায় কবিতার সাথে পাঠকের।স্বপ্ন দেখানো পথে রয়ে যায় মানুষী কলরব।আল মাহমুদ মনে পড়ে যায় তখন:" কবির কাজ স্বপ্ন দেখানো।" অথবা Keats মনে আসতে পারে ---" If poetry comes not as naturally as the leaves to a tree it had better not come at all "। আসলে কবিতার প্রাণ পাঠকের বুকে প্রাণের সজ্ঞীবনী তৈরি করতে না পারলে কবিতার দারিদ্র্য রয়েই যায়। পাঠকের হৃদয় তখন প্রেরণাবিহীন রুদ্ধশ্বাস বন্ধ ডাকঘর।পাঠক তখন স্পষ্ট কোন ধ্বংসের ভেতর ঢুকে যেতে চান বৈমনস্যতায় কিংবা আদিম জীবন বুভুৎসায়।" সুদর্শনা মিশে যায় অন্ধকার রাতে।"জোড়াতালিহীন স্নায়ুর বন্ধনে ঠোঁটের কম্পনে সর্বনাশের ' তুমি ' ও ' আমি ' দাঁড়িয়ে পড়ে এক বিন্দুতে। সুন্দরের হাত কি তাহলে বাঁধা পড়ে গেল অস্তিত্ববাদের অন্বেষণ ও নিয়তিতে? সমুদ্রের পারে এসে বড়ো চাঁদ জাগায় বিস্ময়।পাঠক কবি  পিনাকী বসুর কবিতা পড়ে আবার ফিরে চলে ফেলে আসা পথে ব্যক্তির আত্মপরিসর অতিক্রম করে ' উত্তর -ব্যক্তিতা'র প্যাটার্নে যেখানে প্রাণবস্তুর দারুন মোহময় উপস্থিতির অমোঘ আকর্ষণ ছড়িয়ে রয়েছে কবিতার নাভিমূলে।
" জিনিয়া ফুলটা সবে রোদ কুড়োচ্ছিল 
হঠাৎ দেখা তার সাথে।
এ শরীরেই শরীর লুকিয়েছিল সে। হাতে যৌথপ্রেমের সেই অভিধানটা 
চোখে, আগলে রাখা কতগুলো পুরুষ দুপুর 
আর ঠোঁটের কোলাজে সেই ছোট্ট তিল।"
পাঠকের association গড়ে ওঠে কবির কথনের প্রবচন প্রতিমায়।এই সিম্ফনিক প্রাণপ্রৈতির ডান বাম আলোর উৎসের অনুভবে জেগে ওঠে " চারিদিকে গুঞ্জরিত হয়েছিল কী সব গভীর পল্লব "।

'চারুপত্র প্রকাশনী ' থেকে প্রকাশিত প্রিয় কবি পিনাকী বসুর বাংলা আধুনিক কবিতার সংকলন ' সুখ পোড়া গন্ধ ' গালিবের কথা মনে করায় ----
" হম-নে বহ্শৎকদহ-এ বজম্-এ জাহা -মে জু শমা 
শোলহ্ -এ ইশক্-কো আপনা সর ও সামা সমঝা।"
দুনিয়ার এই ভয়ানক উজার মজলিসে প্রদীপের মতো আমি প্রেমের শিখাতেই আমার সর্বস্ব জ্ঞান করলাম।" শব্দারথৌ সহিতৌ কাব্যময়" --শব্দ ও অর্থের সম্মিলনে যে অপূর্বতা সৃষ্টি হয়,তাই কাব্যের প্রাণ।কবি পিনাকী বসু এই প্রাণের পূজারী।নীল আকাশের এপার থেকে ওপার বিস্তৃত নীলিমায় তার কবিতার রঙ। সাগরের নীল জলের কোলাহলে রৌদ্রও আজ ভালোবাসার হুলুস্থুল ঘটায় আমোদ বিন্যস্ত  মালিন্যবর্জিত ঠোঁটের প্রান্তে বাঁশির সুরে।তার কবিতার ডিসকোর্সে নিঃশব্দচরণে প্রেম আসে দুয়ার মাড়িয়ে।
" সে জানত, ডুবতে চাইলেই শরীর ভিজবে 
তাই বৃষ্টির খবর সে কাউকে জানায়নি।
বুকের মধ্যে উড়তে থাকা মাটি 
আর এক ঠোঁট নিষিদ্ধ আদরের গন্ধ 
সে আড়াল করেছিল চেনা ওড়নায়।"
ভালোবাসার গল্পে পাঠকের মন - বিকেলের গায়ে লেগে থাকা দুঃখ বল্কলের মতো ঝরে পড়তে থাকে। চাঁদ হাসতে থাকে ভালোবাসার তুলো উড়িয়ে ,মহুয়ার গন্ধে একটা নদী ভেসে যায়।গোবিন্দদাস যেন কার্নিশের গা থেকে গুঁড়ি মেরে মেঘের মতো নেমে আসেন ----" আমি তোরে ভালোবাসি অস্থিমজ্জাসহ।"
কবি পিনাকী বসুর Selective attention তার গুরু মস্তিষ্কের সেরিব্রামে। তার কবিতার sound theory ছিঁড়ে ফেলে না ছন্দ , জানালা ভাসানো রোদ। শব্দের ভিতরে তিনি লাভ করেন নবীন চারার দীয়মানতা।
" ষং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ"।
যাহা লাভ করিলে সকলই লাভ হয় তখন অন্য লাভের ইচ্ছা থাকে না।পাঠকের কাছে দীক্ষক তখন কবির অক্ষরেরা।
" তুমি বলতে,গদ্যেরা নাকি ক্ষত্রিয় হয় 
সে কথাতেও একটা আঁশটে ইশারা পেতাম ---

আর তাই 
এখন তোমার ঘড়ির কাঁটার গল্পে 
পাখিদের কলকল শব্দে 
বা রোদ রঙের চুড়িগুলোয় 
আমার ঘামের গন্ধ মাখিয়ে দিয়েছি।" 
একটা fantasy হৃদয়ের অন্ধকার ভেদ করে গৌরবে এক নতুন সৃষ্টির দীপিকা হয়ে ওঠে।ও ভাষা পাঠক সারা গায়ে মেখে উঠে দাঁড়ান মুঠোয় নিয়ে তাজা গোলাপের পাপড়ি।এ কোনো heightened language নয়। Wordsworth এর ভাষায় " language really used by men"।যেন ফুটপাতে কেনা নতুন চিরুনীর দাঁতে লেগে থাকা স্ত্রীলোকের দীর্ঘ কালো চুল। এতোটাই পারিবারিক হয়ে ওঠেন কবি পাঠকের শীতল মাটির উঠোনে।
কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছায়াসঙ্গী যেন ---
" ভালোবাসা ছাড়া কি দ্বিতীয় কোনো উচ্চারণ 
মানায় কবির কন্ঠে?
অস্ত্র নিয়েছিলে হাতে,এই দৃশ্য দেখেছি সবাই।
কিন্তু কে না জানে,
লক্ষ্যের বিচারে সেও শুদ্ধ ভালবাসারই সংগ্ৰাম।"
কবি পিনাকী বসু ঐ আগুনেই মোমবাতি জ্বালান ----
" এই যে তোমার শ্বাসপ্রশ্বাসের ধরন 
একচোখের পাতা নাড়ানো 
অথবা, আঙুলে আঙুল জড়ানো দূরত্ব 
ঐটুকুতেই ভালোবাসার ব্যাস মাপা যায়।

সব অক্ষর দিয়ে শব্দ হয় না ----

আর, প্রেম তো নিছকই একটা রঙ 
যার কোন বার্ধক্য নেই।"
প্রেমের সৌন্দর্যে মল্লার বাজে তারায় তারায়, চাঁদের মলিদায়। একটা মোহনার সন্ধানে ফেরা পাঠকের বুকে কবি আঁকতে থাকেন পৃথিবীর এক কিনার থেকে অন্য কিনার মূর্ত মানবতায়, মেঘের খেয়ালী হৃৎপিণ্ডে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা যেন সংস্কারের রূপ ----" যারা ভারি পন্ডিত তারা সুন্দরকে প্রদীপ ধরে দেখতে চলে আর যারা কবি ও রূপদক্ষ তারা সুন্দরের নিজেরই প্রভায় সুন্দরকে দেখে নেয়, অন্ধকারের মধ্যেও অভিসার করে তাদের মন।"ঠিক এখানেই কবি পিনাকী বসুর কবিতার বিহান।রিফু করা জীবন নিয়েও কবি প্রেমে পড়তে চান বারবার কারণ তার মন- মেঘ যেখানেই থিতু হয় সেখানেই সে বৃষ্টি নামায়।
" হয়ত, আবারও প্রেমে পড়ব 
কারণ ভালোবাসাও, জলের মতই এক অভ্যাস 
অপচয় করলে --- দ্রুত শেষ হয়।" 
চট করে একটা communication গড়ে ওঠে পাঠকের সাথে অক্ষরের। একটুও উদ্বেগ জমে না শুক্লা যামিনীর জ্যোৎস্নায়। বুকের ভেতর ভাসতে থাকে গ্লেসিয়ার যেখানে বালিহাঁস বসে ডাকতে থাকে তার সঙ্গম ইচ্ছায়।
জীবনানন্দের সংহৃষ্ট অক্ষরেরা সন্নিকর্ষে আসে কবির -----
"তবুও অর্থ রয়ে গেছে -----সুপরিসর ঢের:
ম্যামথ বা তার পাঁকের থেকে মানুষ এখন জেগে 
স্বাতীতারার শিশির দিয়ে যে অনিমেষ গল্প বানিয়েছে এবং 
তাই তো প্রেম: যান নিরূপণ ----জ্ঞানের প্রবলতর আবেগে।"
ব্যতিক্রমী ইশারা ডিঙিয়ে কবি খোঁজেন বসন্তের আভাস ডালে কুঁড়ি ধরার খবরে।নাভির মৌতাতে গুনে চলেন অস্বচ্ছ আকাশের চরিত্রের দাগ। সফলকাম আলো জ্বলে আর নেভে ,অব্যয় চিহ্নগুলো কারোরই হয় না। অনেক কষ্ট আঁকড়ে পাতালের ব-দ্বীপটায় দুপা শিশিরে ডুবিয়ে মেয়েটা একাই একটা মায়ের জন্ম দেয়।কবি ভাবতে থাকেন, আজানুলম্বিত কোন আড়াল কিছু কি ইশারা করেছিল?
" যত অস্পষ্টতা ছুঁয়েছ ততই রহস্য বেড়েছে।
এখন দুদিকেই জানালা খোলা --
একবার শূণ্য অভিকর্ষ ছুঁয়ে দেখ 
জিততে গেলে মাঝে মাঝে হারতেও হয়।"
হারই বড়ো শিক্ষক।ফুল পাখি আর প্রেমের কবিতার পাশে এটাও যে জীবন চেনায়। অমলকান্তি কখন যেন পিছন থেকে সামনে এসে চিনিয়ে দিয়ে যায় আমাদের পরিধি।কোমল পিচ্ছিল ছন্দে বৃষ্টি পড়ে ফুলের উদ্যানে রূদালীর মতো। তবুও নিজস্ব নির্জনতায় আয়ুপথ এঁকে রাখে রোদ্দুর হতে না পারার গল্প।
"' অমলকান্তি ' কাল আমার স্বপ্নে এসেছিলেন ---
সবুজ ফেনায় তখনও তার দু-হাত ভেজা।
হ্রস্বই-দীর্ঘই ছাড়াই" এটা -ওটা" গল্প হল।

ব্যস্ত শহরটাকে তিনি বললেন পাঁচমিশালি 
আকাশছোঁয়া ইমারত নাকি ইঁটের খাঁচা।
ছেঁড়াসুতো জুড়ে সে-ই " জানলা " আঁকলেন।
তারপর চেনা স্বরে বললেন " উঠি তাহলে "।"

ভাষার বেগের বিহ্বলতায় অমলকান্তি আজ গভীরতম প্রাণের কামনা থেকে স্খলিত এক কিংবদন্তি চরিত্র কবিতার ক্লান্তিহীন সময়ে।কবি মায়াবলের আশ্রয়ে কোনো ওরাকল উচ্চারণ করেননি। জীবনের লবণাক্ততা আত্মপ্রসাদ নস্যাৎ করে সত্যের সামনে মানুষের চৈতন্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। অমলকান্তিকে personified করে কখন যেন পরাজিত মানুষের গল্প  বানিয়ে ফেলেছেন। এখানেই কবি পিনাকী বসুর সাফল্যনামা।কবি পাঠককে বোঝাতে চেষ্টা করেন,"অসুখ লেগেছে বোধে।"

কবির আত্মগত অনুভবে অযথা চিন্তার ভিক্ষা নেই। নিপাট শব্দেরা আকাশের দিকে চেয়ে তারার আলো মেখে গল্প বলেন জীবনের অভিমুখ যাত্রার।স্বচ্ছ বর্ণনায় বলে ওঠেন সরল নির্যাস ----
"যতটুকু পর্যন্ত দেখতে পাও 
ততটুকুতে আমি নেই।"

           অথবা 
" তোমার কান থেকে কাঁধ 
আর, আমার মুখের ব্যাসার্ধ 
মেলেনি বহুদিন।"
অভিধান পেতে শুয়ে শব্দহীন শব্দের সব রিক্ততা ডানা মেলে উড়িয়ে দেন।
" এখন সবার মুঠোয় জমা ঘাম 
নিস্তরঙ্গ বিছানায় আমলকি রাত।
পোড়া ভাতেও 
ভিজে চাঁদের গল্প।
কেউ শোনে কেউ শোনে না।

শূণ্যতা, তবুও জন্মান্তর চায় না।"
পাতার নীরবতায় ঘেরা থাকলেই ফুল ভবনশিখী হয়ে পেখম মেলে। তবে মৃত্যুর শূণ্যতাও কি কবির চোখে শুধু দরজা হাট করে খোলার প্রতীক?
" কেউ মরে গেলে 
এখন আর কান্না পায় না।
কিছু মুখ আর কয়েকটা চেনা অক্ষরে,
অচেনা মনে হয় শোককে।

মনে হয়,  লোক কমলে 
খাবারের যোগান বাড়বে।
হাতপা ছড়িয়ে বাঁচার পরিসর বাড়বে।
গুটিকয়েক কম লোক 
অন্যের দুঃখে হাসবে।"
একটা paradox এর দুস্তর চাদর গায়ে অন্ধকার বাতাসের।মৃত মাংসের স্তূপ বিস্বাদের ভিতর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। হয়তো নিজেদের গ্লানিকর পরিণতি দেখে ভীত হয় চকিত আলোর পূর্ণ ফটোগ্ৰাফে।

ফরাসি কবি  Alfred de Musset লিখছেন ---
"Know that there is often hidden 
in us a dormant poet, always 
young and alive"। সুকুমার অনুভূতির উপমাময় শ্রদ্ধায় যেন অনুজ্জ্বল শ্যামবর্ণা আকাশে সোনালী রঙের সন্ধ্যাতারা কবির শিক্ষকেরা ---
" আমাদের শিক্ষকেরা ছিলেন গাছের মতন 
কাছে গেলেই আমরা ছায়া পেতাম 
নষ্ট জলেও পেতাম একই স্নেহের গন্ধ 
অথচ আমরা তাদের ফেরিওয়ালা ভাবতাম।

এখন যখন রাজপথে দরজা ধাক্কাই
জটপাকানো সুতোয় হামাগুড়ি দিই 
বিগতযৌবনা সওদারা ফিনফিনে কাগজ গোনে।

ছায়াটার কথা খুব মনে পড়ে ----
এখন তাঁর ছুটির দিন 
কোন দস্তাবেজেই তাঁর নাম নেই।

অথচ, না জিতলেও 
ওনারা কিন্তু হারেন নি।

মরা গাছগুলো আসবাব হয়ে আছে।"

অদ্ভুত শ্রদ্ধার্ঘ্যর সাথে মিশে গেছে শরীরের ভিতর ডুব দেওয়া রোশনাই।চকমকি পাথর হয়ে জ্বলে যায় তার এই সন্নত  আবেগ।উপজ্ঞার সংজ্ঞা হয়ে তার সৃষ্টির উল্লোল ঘটান হৃদয়ের গভীরে এখনও।বর্তমান প্রজন্মের সেই সম্প্রদায়ই আইনের চাপে এবং তাপে জ্ঞানদিৎসায় দুরাপ।হিরণ্য জলে মুখবোজা শাঁস পড়ে থাকে তাদের মধ্যে।সন্ধ্যারও সমাপ্ত ভোরে আজ তারা নীলকন্ঠ।
কবি পিনাকী বসুর কবিতার ঘরানা একটু স্বতন্ত্র। কোথায় যেন না বলা অনেক কথা পাঠকের শ্লেটে লেখা হয়ে যায়।এক 'মায়ার খেলা 'র নৈবেদ্য লেখা হয়ে যায় মৃত্যুর গায়ে ----
" সেই সাদা রাতে 
আমি বুদ্ধের মতন 
সব মায়া, বুনোহাঁসের ডানায় উড়িয়ে 
শুধু জোছনার গন্ধটুকু আগলে রেখেছিলাম 
আমার সেই অলীক ঈশ্বরের জন্য 
যে, এখনও মৃত্যুশোক লিখছে অন্য রাতের গায়ে।"
তাই ' সুখ পোড়া গন্ধ ' আবেশে চিনিয়ে দেয় বৃষ্টির জল আর চোখের জলের তফাৎ, এঁকে দেয় নিষ্পাপ পাতায় আস্ত শরীর রঙ যা আমৃত্যু পাশে থাকবে , প্রজাপতির ডানার ঝাপটায় উড়িয়ে দেয় ডালে ডালে জমা গৃহস্থের ধুলো, বৃষ্টির পাঠশালায় লিখে রাখে কোলাহলের মানে,
কালো পিচ রাস্তায় সাদা কেঁচো মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে জেনে যায় সব মানুষের মেরুদন্ড থাকে না, শরীরের গদ্যে লিখে রাখেন ভালোবাসার এপিটাফ, অভিমান-বৃষ্টির অতিস্নানে যারা ডুবতে চায় তারা পণ্য হয়।  রবীন্দ্রনাথ আসেন শাশ্বত সত্য নিয়ে ----
" এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম 
প্রেম মিলে না,
শুধু সুখ চলে যায় ----এমনি মায়ার ছলনা।"

তবুও কবি পিনাকী বসু দ্বৈততায়, দ্বান্দ্বিকতায়, বৈপরীত্যে মুক্ত সত্তার সন্ধানে ভালোবাসারই হাল ধরেন অমোঘ সুরে --
প্রেম মানেই তুমি, তুমি মানেই প্রেম। কবি লিখছেন ----
" অথচ ভালোবাসার শব্দ আদরে ভিজিয়ে 
আমি তোরই গায়ে মেলে দিই রোজ।
তাই দেখে বৃষ্টিরা জলসা বসায় 
ঝাঁকে ঝাঁকে আলোরা এক্কাদোক্কা খেলে 
কত গল্পছবিই না এঁকেছি দুজনে 
এখন সেই ইজেলটায় ঘুণ ধরেছে।

অবিশ্বাস জড় করা জীবন--বাঁচা নয়রে 
তবু জীবন আছে বলেই বেঁচে আছি।"

এই অপ্রাপ্তিই তো জীবনের মূল সুর যা নিয়েই কোন এক অচিনপুরের ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা । মির্জা গালিবও সেই হৃদয়ের কথাই বলেন যা নীড় থেকে ঢের দূরে পড়ে আছে আবার কেতকীর গন্ধে মাতবে বলে কতো অতৃপ্ত বাসনার ক্ষতচিহ্ন বুকে নিয়ে যেখানে লেখা,হে ঈশ্বর আমার কাছ থেকে পাপের হিসাব চেয়ো না ----
"আতা হৈ দাগ -এ হসরৎ-এ দিল-কা শুমার য়াদ,
মুঝ-সে মেরে গুনাহ্ -কা হিসাব অয় খুদা নাহ্ মাগ"।

                     ***********



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার দ্রুতি ও মন্দন

কবি চন্দন রায়ের কবিতা সংকলনের রিভিউ

কবিতা: নাছোড় বৃষ্টি